নানা কারণে এমনকি মানসিক বিপর্যয়েও হতে পারে হাত পা জ্বালা- পোড়ার যন্ত্রণা। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হাত ও পায়ের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলেই এমনটা ঘটে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি।
পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথির প্রাদুর্ভাব (44.4%), এবং পায়ের পরীক্ষার ক্ষেত্রে (51.1%)। মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে, 60 বছরের বেশি বয়সী রোগীদের মধ্যে এর প্রকোপ 20.0% এবং ≤ 35 বছর বয়সী রোগীদের মধ্যে 8.9% বেড়ে যায়।¹
ত্বকের একটি কারণেও প্রায়শই হাত ও পায়ের জ্বলন সংবেদন দেখা দেয়। তবে, আঙ্গুলগুলিতে জ্বলন অনুভূতি স্নায়ুর ক্ষতির লক্ষণ হতে পারে।
হাত পা জ্বালা পড়ার কারনসমূহ
অনেক কারণে শরীরে বিশেষ করে হাত ও পায়ের তালুতে জ্বালা পোড়া অনুভূত হতে পারে।
যেমন-
১, স্নায়ুজনিত কারণ বা নিউরোপ্যাথি:
আক্রান্ত অংশের স্নায়ুর ওপর চাপ লেগে থাকলে; নার্ভের ক্ষতির কারণে হলে হাত ও পায়ে চামড়া কুঁচকে যাওয়া যাওয়ার ফলে হবে।
স্নায়ু জনিত কারণে ৪ ধরনের নিউরোপ্যাথি আছে,
- পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি (যাকে ডায়াবেটিক স্নায়ু ব্যথা এবং দূরবর্তী পলিনিউরোপ্যাথিও বলা হয়)
- প্রক্সিমাল নিউরোপ্যাথি (এটিকে ডায়াবেটিক অ্যামিওট্রফিও বলা হয়)। এই মায়ো শব্দের অর্থ পেশী, তাই এটি একটি স্নায়ুরোগ যা পেশী দুর্বলতা সৃষ্টি করতে পারে। এটি বিশেষভাবে পায়ের নিতম্ব এবং নিতম্বের উপরের অংশের পেশীগুলিকে প্রভাবিত করে।
- অটোনমিক নিউরোপ্যাথি
- ফোকাল নিউরোপ্যাথি (মনোনুরোপ্যাথিও বলা হয়)
২, হরমোনজনিত কারণ:
মহিলাদের মেনোপোজ-পরবর্তী সময়ে শরীরে হরমোনের তারতম্য ঘটে তখন এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কম থাইরয়েড হরমোন লেভেল বা হাইপো থাইরয়েডিজম জনিত কারণেও এমনটি হয়।
৩, ডায়াবেটিস:
যারা দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস রোগে ভুগছেন বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে না এসব রোগীর পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি বা ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি দেখা যায়; পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি রুগীর আরো যেসকল উপসর্গ থাকে, যেমন নিম্ন রক্তচাপ, পড়ে যাওয়া ও হাটতে কষ্ট হয়।
পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি
পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি, মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের বাইরে অবস্থিত স্নায়ুর ক্ষতির ফলে হয়। প্রায়ই দুর্বলতা, অসাড়তা এবং ব্যথা সৃষ্টি করে, সাধারণত হাত ও পায়ে।
এটি হজম, প্রস্রাব এবং রক্ত সঞ্চালন সহ অন্যান্য ক্ষেত্র এবং শরীরের ফাংশনকেও প্রভাবিত করতে পারে।
ডায়াবেটিস ছাড়া পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথির অন্যান্য সম্ভাব্য কারণগুলির মধ্যে রয়েছে:
- অটোইমিউন ডিজিজ,
- টক্সিন,
- মদ্যপান এবং
- সংক্রমণ।
৪, ভিটামিনের অভাব জনিত কারণে:
কিছু কিছু ভিটামিন বা মিনারেলের অভাবে এ ধরনের সমস্যা দেখা যায়। এসবের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে হাত ও পায়ের তালুতে জ্বালা পোড়া অনুভূত হতে পারে।যেমন-
- থায়ামিন,
- পাইরিডক্সিন,
- সাইনোকোবালসিন,
- ক্যালসিয়াম,
- ভিটামিন-ডি ইত্যাদি
৬, ঔষধ:
কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ সেবন করার ফলেও হাত ও পায়ে ঝাঁকুনির সৃষ্টি হতে পারে।
- কেমোথেরাপির ওষুধ,
- ভিটামিন বি 6 ওভারডোজ,
- এইচআইভি ওষুধ,
- অ্যামিডেরন,
- আইসো নিয়াজিড,
- মেটফর্মিন এবং অন্যান্য।
৭, পায়ে ছত্রাক আক্রমন:
পায়ের আঙুলে ছত্রাক সংক্রমন এর ফলে এমন হতে পারে।
৮, হাত-পায়ে রক্ত চলাচলে সমস্যা:
- রেনাউড রোগ
- বারজার্স রোগ
৯, মানসিক চাপ :
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপেও হাত-পা জ্বালা পোড়ার প্রবণতা বেড়ে
যায়।
১০, পানি শূন্যতা :
আবার সাধারণত অনেক সময় দেখা যায় যে, পানি কম পান করলে শরীর কষে যায় এবং এতে হাত-পা ও শরীরে জ্বালা-পোড়ার প্রবণতাটাও বেড়ে যেতে পারে।
১১, কিডনি ফেইলিওর:
বার্নিং ফুট সিন্ড্রোম, যা কিডনি ফেইলিউরের ১০% এরও কম রোগীদের মধ্যে দেখা যায়, দূরবর্তী নিম্ন প্রান্তের ফোলাভাব এবং কোমলতাকে প্রতিনিধিত্ব করে। পেরিফেরাল নার্ভ ডিসফাংশনের শারীরিক লক্ষণগুলি প্রায়ই গভীর টেন্ডন রিফ্লেক্সের ক্ষতির সাথে শুরু হয়, বিশেষ করে গোড়ালি এবং হাঁটুতে।
হাত পা জ্বালা পোড়ার পরীক্ষা-নিরীক্ষা সমূহ;
- ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফি (ইএমজি)।
- নার্ভ কন্ডাকশন টেস্ট বা স্নায়ু বাহন অধ্যয়ন- স্নায়ুর ক্ষমতা পরীক্ষা করে। উদ্দীপিত হয়, এবং সেই স্নায়ু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত পেশীগুলির প্রতিক্রিয়া পরিমাপ করা হয়।
- ল্যাবরেটরি পরীক্ষা- রক্ত, প্রস্রাব
- মেরুদণ্ডের তরল পরীক্ষা-
- সাধারণ রক্ত পরীক্ষা করে ভিটামিনের স্তরগুলি পরীক্ষা করা যায়।
- টিস্যু বায়োপসি - খুব কমই, কোনও ডাক্তার পরামর্শ দিতে পারেন স্নায়ুর টিস্যুগুলির একটি অংশ কেটে একটি মাইক্রোস্কোপের নীচে পরীক্ষা করার জন্য।
হাত পা জ্বালা পোড়ায় করণীয়
- ১, জ্বালা- পোড়া হঠাৎ শুরু হয়ে খারাপের দিকেই যাচ্ছে বা এর সঙ্গে হাত-পায়ের আঙ্গুল বা পায়ের পাতায় অনুভূতি কমে যাচ্ছে, অবশ মনে হচ্ছে ইত্যাদি লক্ষণ থাকলে অবহেলা করবেন না। আপনার হাত ও পায়ের স্নায়ু ঠিক আছে কিনা তা বুঝার জন্য অনেক সময় পরীক্ষা-নিরীক্ষারও প্রয়োজন নেই। চিকিৎসক একটি আলপিন বা একটি টিউনিং ফর্ক ব্যবহার করেই পায়ের অনুভূতিগুলো যাচাই করে নিতে পারবেন।
- ২, যারা ডায়াবেটিসের রোগী তারা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখুন, হাত-পায়ের যত্ন নিতে শিখুন। বিশেষ করে পায়ের যত্ন।
- ৩, যাদের হাত বা পায়ের স্নায়ু সমস্যা আছে, তারা পায়ের যেকোন ক্ষতের দ্রুত চিকিৎসা করুন। পায়ে গরম সেঁক নিতে, নখ কাটতে এবং জুতা বাছাই করতে সাবধান হোন।
- ৪, হাত পায়ের সমস্যার জন্য সব সময় যে ভিটামিনের অভাবই দায়ী, তা নয়। তাই সব ধরনের সমস্যায় ভিটামিন বি খেয়ে উপকার নাও পেতে পারেন।
- ৫, দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ কমান। প্রয়োজনে চিকিৎসা নিন।
- ৬, নিউরোপ্যাথি আছে প্রমাণিত হলে স্নায়ুর যন্ত্রণা লাঘব করে এমন কিছু ওষুধ পাওয়া যায়। চিকিৎসকের পরামর্শে সেগুলো সেবন করতে পারেন।
- ৭, সাধারণত যারা পানি কম পান করেন তাদের উচিত বেশি পরিমাণে পানি পান করা এবং মিনারেল জাতীয় খাবার বেশি পরিমাণে খাওয়া। এতে করে হাত-পা ও শরীর জ্বালা-পোড়া অনেক অংশে কমে যাবে।
হাত পা জ্বালা পড়ার চিকিৎসা;
স্নায়ু রোগের জন্য উপকারী খাদ্য ও ভেষজ সামগ্রী সাহায্য করতে পারে। যেমন, আদা, হলুদ, লবঙ্গ, দারুচিনি, ভিটামিন সি, ইত্যাদি।
জ্বলন্ত পা চিকিত্সার মধ্যে রয়েছে নিউরোপ্যাথির দ্বারা সৃষ্ট ব্যথা এবং অস্বাভাবিক সংবেদনগুলির চিকিত্সা। পা জ্বলানোর জন্য সাধারণত কিছু নির্দিষ্ট ওষুধগুলির মধ্যে রয়েছে:
- অ্যামিট্রিপ্টাইলাইন
- কার্বামাজেপাইন
- ডেসিপ্রামাইন
- ডুলোক্সেটিন
- গ্যাবাপেন্টিন
- প্রেগাব্যালিন
- টপিরমেট
- ভেনেলাফ্যাক্সিন
সূত্র, 1-Prevalence of peripheral neuropathy, amputation, and quality of life ... - Nature
মন্তব্যসমূহ